
বাসাবাড়ি, রান্নাঘর, বাথরুম কিংবা রাস্তায় যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার দুর্ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার করা জরুরি। তবে তাড়াহুড়ো করে তাঁকে স্পর্শ করতে গেলে উদ্ধারকারীও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে পারেন। তাই প্রথম কয়েক মিনিটে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে উদ্ধারের আগে নিশ্চিত করতে হবে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে কি না। এরপর আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সিপিআর (CPR) ও পোড়া স্থানের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে।
প্রথমেই নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তি যদি তখনো বিদ্যুতের উৎসের সংস্পর্শে থাকেন, তাহলে তাঁকে সরাসরি স্পর্শ করা যাবে না। সম্ভব হলে মূল সুইচ, সার্কিট ব্রেকার বন্ধ করে অথবা প্লাগ খুলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। এ সময় হাত ও আশপাশের জায়গা শুকনো রাখতে হবে।
দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করা সম্ভব না হলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে শুকনো কাঠের লাঠি বা ঝাড়ুর হাতলের মতো বিদ্যুৎ অপরিবাহী বস্তু দিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিদ্যুতের উৎস থেকে আলাদা করার চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পড়ে থাকলে কাছে যাওয়া যাবে না। অন্যদেরও নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ও জরুরি সেবায় খবর দিতে হবে।
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তি সচেতন আছেন কি না পরীক্ষা করতে হবে। তাঁর কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে ডাকতে হবে। এরপর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক আছে কি না দেখতে হবে। বুক ওঠানামা করছে কি না পর্যবেক্ষণ করে সর্বোচ্চ ১০ সেকেন্ডের মধ্যে শ্বাসের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস না নিলে বা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে না পারলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করে সিপিআর শুরু করতে হবে। সিপিআর দেওয়ার সময় বুকের মাঝখানে হাতের তালুর নিচের অংশ রেখে প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার চাপ দিতে হবে। চাপ দিতে হবে দ্রুত ও দৃঢ়ভাবে। কাছে অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (AED) থাকলে সেটি চালু করে যন্ত্রের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
অন্যদিকে, আক্রান্ত ব্যক্তি সচেতন থাকলে তাঁকে শুইয়ে বিশ্রামে রাখতে হবে। শরীরের কোথাও পোড়ার চিহ্ন আছে কি না পরীক্ষা করতে হবে এবং অযথা হাঁটাচলা করতে দেওয়া যাবে না। ব্যক্তি শ্বাস নিলেও অচেতন থাকলে ঘাড় বা মেরুদণ্ডে আঘাতের আশঙ্কা না থাকলে তাঁকে একপাশে কাত করে রিকভারি পজিশনে রাখা যেতে পারে। এ সময় নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
বৈদ্যুতিক শকে শরীরের কোনো অংশ পুড়ে গেলে আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা স্থিতিশীল হওয়ার পর পোড়া স্থানটি অন্তত ২০ মিনিট ঠান্ডা প্রবাহমান পানির নিচে রাখতে হবে। তবে বরফ বা অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি ব্যবহার করা যাবে না। এরপর পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত, ত্বকে আটকে যায় না এমন ড্রেসিং বা কাপড় দিয়ে পোড়া স্থান ঢেকে দিতে হবে। ফোস্কা ফাটানো যাবে না। পোড়া জায়গায় মাখন, তেল, টুথপেস্ট কিংবা কোনো ধরনের মলম লাগানো থেকেও বিরত থাকতে হবে।
শরীরের পোড়া স্থানের কাছাকাছি থাকা আংটি, ঘড়ি বা আঁটসাঁট পোশাক খুলে ফেলতে হবে। তবে ত্বকের সঙ্গে লেগে থাকা কাপড় টেনে সরানো যাবে না। শুধু বিদ্যুৎ লাগার স্থান নয়, শরীরের অন্যান্য অংশেও পোড়ার চিহ্ন আছে কি না খেয়াল রাখতে হবে। কারণ বিদ্যুৎ শরীরের এক অংশ দিয়ে প্রবেশ করে অন্য অংশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে উদ্ধারের সময় কিছু ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি। বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে তাঁকে স্পর্শ করা যাবে না। ভেজা কাপড়, ধাতব বস্তু বা খালি হাতে তাঁকে সরানোর চেষ্টা করা যাবে না। বিদ্যুৎ সংযোগ চালু থাকা অবস্থায় ব্যক্তি বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ওপর পানি ঢালা যাবে না। আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাবার বা পানীয় দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। পড়ে গিয়ে আঘাত পেলে অপ্রয়োজনে তাঁকে নড়াচড়া করানো উচিত নয়।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। কারণ শরীরে দৃশ্যমান ক্ষত না থাকলেও ভেতরে গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে। বৈদ্যুতিক প্রবাহ হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এ ছাড়া পেশির ক্ষতি, কিডনির ওপর চাপ, হাড় ভাঙা এবং স্নায়ুর সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
২০২৩ সালে ‘ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ইন কার্ডিওলজি’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বৈদ্যুতিক আঘাতের ৩৩৩টি ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে হৃদ্স্পন্দনের ছন্দে অস্বাভাবিকতা বা অ্যারিথমিয়া দেখা যায়। গবেষণায় অধিকাংশ ঘটনাই ছিল এক হাজার ভোল্টের নিচের নিম্ন ভোল্টেজের আঘাত।
একই বছর ‘ব্রিটিশ প্যারামেডিক জার্নাল’-এ প্রকাশিত আরেকটি পর্যালোচনায় বিলম্বিত অ্যারিথমিয়ার কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়ে গবেষণার তথ্য সীমিত হওয়ায় সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর হাসপাতালে গিয়ে ইসিজি (ECG) করানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে গেলে, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন, খিঁচুনি কিংবা শরীরের কোনো অংশ অসাড় হয়ে গেলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে উদ্ধারের প্রথম শর্ত নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে পারে।